কাণ্ডজ্ঞানহীন কাজ করেনি এমন ব্যক্তি হয়তো খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, তবে আমি বলব অন্য একটি ঘটনার কথা, ঘটনাটি মিনি ও তার মুষিককে নিয়ে :– (সিদ্ধিদাতা গণেশায় নম:) গণেশ দাদার বাহন (ইঁদুর), দিনের পর দিন কাণ্ডজ্ঞানহীন কাজ করেই চলেছে আর তার খেসারত দিতে হচ্ছে ছোট্ট মিনিকে। মিনি গাছ লাগাতে ও গাছের পরিচর্যা করতে খুব ভালবাসে, সে গাছেদের সঙ্গে কথা বলে, গল্প করে আপন মনে।
প্রাচীরের নিচের টবের ওই গাছগুলো মিনির প্রকৃত বন্ধু, এত আগান-বাগান কত কিছু গাছগাছালি থাকতে মিনির ওই টবের গাছের দিকে গণুদাদার বাহনের নজরটা পড়ল? টগর, জবা, বেল, জুঁই, দোপাটি—রাতে এদের সুস্থভাবে ঘুমাতে দিচ্ছে না, গণুদাদার বাহনটা এসে তাদের বাড়িতে ঘাঁটি গেড়েছে। পুজোর সময় গণুদাদাকে এতবার বললাম তোমার বাহনকে বলো যেন আমার টব বাগানের গাছের গোড়ার মাটিগুলো ওইভাবে আলগা করে ঢাই করে টবের নিচে ফেলে না দেয়, এমন কাণ্ডজ্ঞানহীনের মতো যেন কাজ না করে তার মুষিক বাহন।
এমন কাণ্ডজ্ঞানহীনতার কাজ করলে কার না কষ্ট হয় বলো তো বন্ধুরা? আমি গণুদাদাকে বললাম, তোমার পুজোর সময় আরো দুটো লাড্ডু বেশি করে দেব, না হয় তুমি খেও। আর তোমার বাহনটাকে একটু মানা করে দিও প্লিজ। যথারীতি পরদিন সকালেও সেই একই অবস্থা দেখে টবের সমস্ত মাটি খুঁড়ে এক্কেবারে একসার। গাছ বন্ধুদের কষ্ট মিনির আর সহ্য হল না, সে তার গণুদাদার পায়ে হত্যে দিয়ে পড়ে আছে। মিনি মনে মনে ভাবল গণুদাদার বাহনকে এই কাণ্ডজ্ঞানহীন কাজ করার প্রয়াস হতে বিরত করাতেই হবে। কিন্তু এই কথাটা যদি দাদুর কানে ওঠে, দাদু তবে তার চাষের জমির বিষ খাইয়ে গণুদাদার বাহনকে মেরে ফেলবে। এই কাণ্ডজ্ঞানহীন কাজ তো মিনি সহ্য করতে পারবে না। তাই মিনি নিজেই সতর্ক পাহারায় রত হল, কাউকে কিছু বুঝতে দিল না।
সে সন্ধ্যে থেকেই প্রাচীরের নিচে আর দোতলার ঘরে সতর্ক পাহারায় ব্যস্ত থাকল, অন্য সকলের চোখ এড়াতে পারলেও মিনি কিন্তু তার ঠাকুমার চোখকে এড়াতে পারল না। ঠাকুমা বললেন, “দিদিভাই হচ্ছেটা কী?” মিনি মুখে আঙ্গুল দিয়ে ঠাকুমাকে বলে “চুপ চুপ! মা, বাবা, দাদু এরা যেন কেউ টের না পায়।” ঠাকুমা মিনিকে বলল, “দিদিভাই তবে আমিও তোমার সঙ্গী হলাম। কাউকে কিছু বলবো না।”
এবার নাতনি আর ঠাকুমা দুজন মিলে গণুদাদার বাহনকে ধরার ফাঁদ পাতলো। টবের মাটির মধ্যে জাল বিছিয়ে মুষিক বাবুর জন্য সুস্বাদু খাবার রেখে দিল। আর জালটা এমনভাবে বিছিয়ে রাখল যাতে খাবার খেতে গিয়ে সহজেই ওর পা আটকে জালের মধ্যে ঢুকে থাকতে পারে। মিনি ঠাকুমার কাছে রাতে ঘুমাত, সেই জন্য মুষিক ধরার পথে কোন বাধা রইল না। নিশুতি রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে কাদা সেই সুযোগে টর্চ লাইট হাতে নাতনি আর ঠাকুমা মুষিক ধরার পাহারাতে রত।
ঘড়িতে ঠিক ভোর চারটে এমন সময় মুষিকবাবু এসে প্রথমে জুঁই, বেল, টগর গাছের টবের মাটিগুলো ফেলতে শুরু করল, তারপর শেষে এল জবা গাছের টব। মধ্যে প্রবেশ করতেই মিনি ও তার ঠাকুমার পাতা ফাঁদের মধ্যে এসে পড়ল। মুষিক বাবু আনন্দ করে সুন্দর সুস্বাদু খাবার খেতে লাগলো, আর একটু একটু করে জালে তার পা আটকে যেতে লাগলো, আস্তে আস্তে পুরো জালের মধ্যেই আটকে গেল মুষিক বাবু।
এদিকে আস্তে আস্তে ভোর হয়ে এলো, মুষিক জালে আটকা পড়ায় দুজনাই আনন্দে হাততালি দিতে লাগলো। হাততালি শুনতে পেয়ে বাড়ির ও আশেপাশের কিছু লোকজন জড়ো হয়ে গেল। সে কি এক কাণ্ড! গণেশ ঠাকুরের বাহনকে ঠাকুমা আর নাতনি মিলে খাঁচায় বন্দি করল আর পাড়ার লোকজন ভিড় করে দেখতে এলো, অনেকেই উপহাস করতে লাগলো আবার কেউ কেউ হেসেই কুটিকুটি। আজকাল মানুষেরই কাণ্ডজ্ঞান থাকে না, তো ইঁদুরের আবার কাণ্ডজ্ঞান! মিনি কিন্তু ওদের কোন কথায় কর্ণপাত করল না। মিনিদের বাড়ির এক কোণে খাঁচায় ইঁদুরটিকে রেখে দিল আর বেশ যত্ন করে মিনি মুষিককে খাওয়াতে লাগলো।
অবশেষে বাড়ির সকলের কথায় ইঁদুরটিকে জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেওয়া হল। মিনির সহজ এবং সরল কাণ্ডজ্ঞানকে শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং ঠাকুর গণেশ দেবতাকে প্রণাম জানিয়ে এই ছোট্ট গল্পটি শেষ করলাম।
